দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকে জনবল সংকটে নেটওয়ার্ক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতে একদিন তিন হাজারের বেশি টাওয়ার (বিটিএস) বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে বাংলালিংকের গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বাংলালিংক সমস্যা প্রতিরোধে তৃতীয় পক্ষ হুয়াওয়েকে নেটওয়ার্ক দেখার দায়িত্ব দিলেও কার্যত সেই প্রকল্পও ব্যর্থ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

দেশে সবচেয়ে দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা এই অপারেটরটির সারাদেশে মোট ৯ হাজার টাওয়ার রয়েছে। কিন্তু গত বছর কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে এ বছর ঝড়-বৃষ্টির সময় নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া টাওয়ারগুলো আগের অবস্থায় ফিরে আনতে হিমশিম খাচ্ছে অপারেটরটি। গত ১৫ মে একসঙ্গে তিন হাজার সাইট ডাউন (নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন) হয়ে যায়। পরের দিন ১৬ মে ১২ শতাধিক সাইট ডাউন হয়ে যায়। এর আগের সপ্তাহে একদিনে ১৮ শতাধিক সাইট ডাউন ছিল।

লোকবল না থাকায় ইতোমধ্যে বাংলালিংক সারাদেশে ১৫টি অপারেশন অ্যান্ড মেইন্টেইন অফিসও বন্ধ করে দিয়েছে। এসব অপারেশন এখন ঢাকা থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা থেকে সব কিছু ঠিক মতো চললেও নেটওয়ার্ক চালাতে পারছে না অপারেটরটি। কোনো সাইট ডাউন হলে অফিসে একটি সংকেত আসে। কিন্তু এখন সংকেত আসলেও লোক পাঠাতে পারছে না। ডাউন সাইটগুলো আপ করতে কোনো কোনো সময় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলালিংকের টাওয়ারগুলোতে পুরানো, নষ্ট যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি এবং জেনারেটর থাকার কারণে বেশি ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ না থাকলে টাওয়ার চালাতে ব্যাটারির ওপর ভরসা করতে হয়। আগে যেসব ব্যাটারি ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিতে সক্ষম ছিল সেগুলো এখন দিচ্ছে মাত্র ১-২ ঘণ্টা। এরপর ব্যাটারি ব্যাকআপ শেষ হলে ভরসা করতে হয় জেনারেটরের ওপর। কিন্তু পুরানো জেনারেটরগুলোও ঠিক মতো কাজ করছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে জনবল সঙ্কটের কারণে। গত বছর বাংলালিংক থেকে দুই দফায় ১১ শতাধিক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু টেকনিক্যাল থেকে চার শতাধিক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এর কারণে এখন সাইট ডাউন হলে তাৎক্ষণিক সেবা দিতে পারছে না বাংলালিংক।

অবশ্য বিকল্প হিসেবে অপারেটরটি ‘শুধু ঝড়-বৃষ্টির তিন মাস’ লোক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে সাময়িক এই চাকরিতে যোগদান করবে এমন লোক পাচ্ছে না অপারেটরটি। এরপর বাংলালিংকের নেটওয়ার্ক বিপর্যয় প্রতিরোধে পরীক্ষামূলক হুয়াওয়েকে এফএলএম-১ (ফিল্ড লেভেল মেইন্টেইন্স) নামের একটি পাইলট প্রজেক্ট দেওয়া হলেও সে প্রকল্পও সফলতার মুখ দেখতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলালিংকের একজন কর্মকর্তা প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘সিডরের মতো বড় ঝড়ে বাংলালিংকের মোটে ১৫০টি সাইট ডাউন ছিল। অথচ এখন সামান্য বৃষ্টিতে গড়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক সাইট ডাউন হয়ে যাচ্ছে। আগে কোনো টাওয়ারের সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য কর্মীরা ছুটে যেত; সেখানে এখন কর্মী সংকট থাকায় ডাউন সাইট আপ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

অবশ্য নেটওয়ার্ক সমস্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে বাংলালিংক কর্তৃপক্ষ। অপারেটরটির হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস আসিফ আহমেদ প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের নানান কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আবহাওয়ার বৈরি অবস্থা এবং গ্রাহকদের ফোনে বাড়তি ব্যবহারের কারণে কিছু এলাকায় আমাদের সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে মানসম্মত সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের নেটওয়ার্ক অপারেশন এবং কাস্টমার সার্ভিস টিম ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে।’

হুয়াওয়ের কাছে দেওয়া বাংলালিংকের পাইলট প্রজেক্ট এফএলএম-১ (ফিল্ড লেভেল মেনেটেনেন্স) সম্পর্কে তিনি বলেন, এফএলএম হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং আমরা এই কার্যক্রমে সন্তুষ্ট। এখানে সাময়িক সমস্যা হতে পারে তবে তা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা কোনো প্রজেক্ট শুরু করলে সেটা সর্বোচ্চ ভালো সেবা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Share.

About Author

Leave A Reply