ভারতের ডিমাপুরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত এক জঙ্গলঘেরা রানওয়েতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম ইউনিট। নাম রাখা হয় ‘কিলো ফ্লাইট’। সাকল্যে সম্বল ছিল দুটি জীর্ণ বিমান ও একটি হেলিকপ্টার। তা-ই নিয়ে মাত্র দুই মাসের প্রশিক্ষণে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরে হয় তাঁদের প্রথম সফল অভিযান।
মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে পাকিস্তানি বাহিনীর দুটি তেলের ডিপোতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি মজুত ছিল। তাদের স্থল, নৌ আর আকাশযানগুলোর জ্বালানি সরবরাহ করা হতো এসব ডিপো থেকে। আর তা যদি ধ্বংস করা যায়, তবে হানাদারেরা পড়বে জ্বালানি-সংকটে। আর সেই দায়িত্ব পড়ে কিলো ফ্লাইটের ওপর।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রথম এই অভিযানের গল্প নিয়ে স্মার্টফোনের জন্য গেম বানিয়েছেন ইন্টার্যাদকটিভ আর্টিফ্যাক্ট নামের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তিন তরুণ—দেবাশীষ সরকার, মহিবুল হক ও তাসফিয়া সাজ্জাদ। বিমানবাহিনীর ইউনিটের সঙ্গে মিলিয়ে গেমটির নাম তাঁরা দিয়েছেন ‘কিলো ফ্লাইট’। ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়ে ২৪ মে তাঁদের সঙ্গে কথা হয় গেমটি নিয়ে। দেবাশীষ গেমটির মূল ডেভেলপার। মহিবুল যুক্ত আছেন ডেভেলপার ও ডিজাইনার হিসেবে। আর তাসফিয়ার কাজ মূল ডিজাইন।
মহিবুল গেমটির পটভূমি ও কিলো ফ্লাইটের সেই অভিযানের কথা বলেন। ভারতের মণিপুরের কৈলাশহর থেকে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে একটি অটার বিমান উড়ে যায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গার উদ্দেশে। লক্ষ্য ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল ডিপো ধ্বংস। অটারের তিন আরোহী ক্যাপ্টেন শরফুদ্দিন, ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম। কৈলাশহর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে উড়ে বঙ্গোপসাগরে এসে সমুদ্র ধরে চট্টগ্রাম পৌঁছে যায় অটারটি। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শুরু হয় তাদের রকেট আক্রমণ। জ্বলে ওঠে ট্যাংকারগুলো আর বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে একের পর এক।
কানাডার তৈরি অটার বিমানটি মূলত বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হতো। যুদ্ধের উপযোগী করতে এতে রকেট পড লাগানো হয়। পেছনের দরজা খুলে বসানো হয় মেশিনগান। আর মেঝের পাটাতন খুলে ২৫ পাউন্ডের ১০টি বোমা যুক্ত করা হয়। অন্যদিকে আগরতলার তেলিয়ামুড়া থেকে উড়ে গিয়ে এলুয়েট হেলিকপ্টারটি গোদনাইল তেল ডিপো ধ্বংস করে আসে।
কিলো ফ্লাইট গেমে কাহিনি মূলত অটার বিমানের অভিযান কেন্দ্র করে এগিয়ে গিয়েছে। এর বড় আকর্ষণ হলো গেমটি তৈরি করা হয়েছে অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রযুক্তিতে। সহজ বাংলায় মিশ্র বাস্তবতা বলা চলে। বই-খাতা, ভিজিটিং কার্ড কিংবা এক ফালি কার্ডবোর্ড থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত আলো আছে এমন সমতল যেকোনো কিছুকে গেমের গ্রাফিকসের ভিত্তি ধরে খেলা যাবে।
ধরা যাক, এক পাতা এ৪ আকারের কাগজকে ভিত্তি ধরে কিলো ফ্লাইট খেলা হবে। সে ক্ষেত্রে গেমটি চালুর পর ক্যামেরার মাধ্যমে পৃষ্ঠতল স্ক্যান করার সময় কাগজটি ফ্রেমের মধ্যে রাখতে হবে। এরপর শুরু হবে গেম। বৈমানিকের ভূমিকায় খেলতে হবে গেমারকে। গুলি ও মিসাইল ছুড়ে তেলের ডিপো ধ্বংস করতে হবে। এরপর ধ্বংস করতে হবে সৈনিকের ব্যারাক। অন্যদিকে হানাদার বাহিনীও গুলি ও মিসাইল ছুড়ে বিমান ভূপাতিত করার চেষ্টা করবে। আপনাকে সেগুলো এড়িয়ে যেতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, সেই কাগজ ঘুরেফিরে লক্ষ্য নির্ধারণ ও গুলি এড়ানো যাবে।
প্রাথমিকভাবে গেমটির একটিই লেভেল থাকছে। তবে ভবিষ্যতে কিলো ফ্লাইটের কাহিনি ধরে আরও মিশন যোগ করা হবে বলে জানান দেবাশীষ সরকার। গেমটির তৈরির পেছনের কথা বলেন তাসফিয়া। তিন তরুণের সবাই ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন। তখন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা ছিল তাঁদের। চলতি বছরের ১৯ মার্চে অনেকটা হুট করেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গেম ছাড়বেন। সবকিছু পরিকল্পনাও করেন। কিন্তু এত সংক্ষিপ্ত সময়ে গেম বানানো সম্ভব ছিল না। অবশেষে ২২ মে কিলো ফ্লাইট প্রকাশ করেন তাঁরা। গেমটি এখন শুধু অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের জন্য গুগল প্লে স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে। গেমটি নামানোর ঠিকানা https://goo.gl/9jWCI8।

Share.

About Author